চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় চলন্ত টমটম আটকে দিনদুপুরে প্রধান শিক্ষককে টেনেহিঁচড়ে নামানোর ঘটনা ঘটেছে। এ সময় কেড়ে নেওয়া হয় তার মোবাইল ফোন। চলে চরম হেনস্তা। অভিযোগের তীর স্থানীয় বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন ও তার বাহিনীর দিকে।
অভিযোগ উঠেছে, স্কুল কমিটিতে নিজেদের পছন্দের সভাপতি বসাতে না পেরেই এই তাণ্ডব। এমনকি গভীর রাতে অস্ত্র হাতে বাড়িতে গিয়ে দেওয়া হয়েছিল প্রাণনাশের হুমকি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় বাজালিয়া উচ্চ বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি পদকে কেন্দ্র করে ঘটনার সূত্রপাত। এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশকে টমটম থেকে নামিয়ে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে হেনস্তার ঘটনা ঘটে। আর এতে নেতৃত্ব দেন স্থানীয় বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন ও তার ছোট ভাই মহিউদ্দিন।
প্রধান শিক্ষকের অভিযোগ, সভাপতি পদের পছন্দের লোক বসাতে বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত আনুমানিক ৯টায় ‘মাছ লিটনের’ নেতৃত্ব সশস্ত্র একদল লোক প্রধান শিক্ষকের বাড়িতে গিয়ে ঘন্টাখানেক অবস্থান করেন। এরপর তারা প্রধান শিক্ষককে ‘মৃত্যুর হুলিয়া’ দিয়ে বাড়ি ছেড়ে যান তারা।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে টমটম থেকে নামিয়ে প্রধান শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশকে হেনস্তা করা হয়। এরপর দলবল নিয়ে খোদ স্কুলে গিয়েও প্রধান শিক্ষকের কক্ষে চড়াও হতে চাইলে, স্থানীয়দের প্রতিরোধের মুখে তা আর সম্ভব হয়নি।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্প্রতি বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের এডহক কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে ওই কমিটি এখনো ঘোষণা করা হয়নি। এই কমিটিকে কেন্দ্র করেই প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বাধে।
শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশের অভিযোগ, প্রস্তাবিত এডহক কমিটির সভাপতি পদে তিনজনের একজন আব্দুল ওয়াহাবের ইন্ধনে স্থানীয় বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন ও তার ছোট ভাই মহিউদ্দিন এ ঘটনা ঘটান। প্রস্তাবিত সভাপতিদের মধ্যে আব্দুল ওয়াহাবের পক্ষে সুপারিশ করেন চট্টগ্রাম-১৪ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন আহমেদ। এ ছাড়া সংসদ সদস্য জসিমের এপিএস আসলাম দফায় দফায় হুমকিও দেন তাকে।
২০২৫ সালে প্রায় আড়াই মাস এডহক কমিটির দায়িত্বে ছিলেন আব্দুল ওয়াহাব। শিক্ষক ও অভিভাবকদের অসন্তোষের মুখে আব্দুল ওয়াহাবকে সভাপতি মনোনীত করা ওই কমিটি বাতিল করা হয়। এবারও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতির পদ পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। মূলতই স্কুল কমিটি গঠন নিয়ে মতবিরোধ ও ধীরগতির কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শিক্ষক মিল্টন বিকাশ দাশ বলেন, ‘আমি টমটমের সামনের সিটে বসা ছিলাম। হঠাৎ তারা এসে আমাকে নামান। আমার ফোন কেড়ে নেন।’
টমটম চালক আহমেদ শফি বলেন, ‘আমি বাজালিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষককে নিয়ে যাচ্ছিলাম। মাঝপথে তসলিম ও তার ভাই মহিউদ্দিন তাকে গাড়ি থেকে নামান। তার ফোন কেড়ে নেন।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল ওয়াহাব বলেন, ‘তাকে কেউ হেনস্তা করেনি। তার সঙ্গে কথা বলে অফিসে গেছে। সেখানে তিনি লোকজন আনছেন। তার লোকজন ঝামেলা করছে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে মহিউদ্দিন বলেন, ‘তার কাছ থেকে আমাদের কেউ ফাইল নেননি। পুলিশ তার কাছ থেকে ফাইল নিয়ে গেছে।’
স্থানীয় বিএনপি নেতা তসলিম উদ্দিন বলেন, ‘এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক যা বলেছেন, সব মিথ্যা। তিনি বলেছেন, বিএনপির কাউকে এই স্কুলে ঢুকতে দেবেন না।’
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ইদ্রিস মিয়া বলেন, ‘সুশিক্ষিত জাতি গঠনে শিক্ষকদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রধান শিক্ষককে প্রকাশ্যে হেনস্তার বিষয়টি যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে ওই শিক্ষকের আইনের আশ্রয় নেওয়া উচিত। আর এখন যেহেতু সেখানে বিএনপির কমিটি নেই তাই আমরা সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারছি না।’
সামান্য বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় চট্টগ্রাম নগরের নিচু এলাকা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জমে থাকা পানিতে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয় নগরবাসীকে। যানজট আর জলজটের সেই ভোগান্তি যেন হুট করেই হাওয়া হয়ে গেল। দুদিন ধরে টানা ভারী বর্ষণ; কিন্তু চট্টগ্রামে নেই সেই চিরচেনা দুর্ভোগের দৃশ্য। বৃষ্টি হলেই হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে ডুবে থাকত যেসব এলাকা, সেখানেও এখন পানি নেমে যাচ্ছে অনায়াসে।
কী এমন ম্যাজিক কাজ করলেন চট্টগ্রাম নগরীতে, যে রাতারাতি পাল্টে গেল দৃশ্যপট। উত্তর জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, ম্যাজিক নয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরদারির সুফল মিলেছে এবার। প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি মনিটরিং ও সমন্বিত উদ্যোগের কারণেই টানা দুদিনের ভারী বর্ষণেও চট্টগ্রাম নগরীতে উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা হয়নি।
চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন কালবেলাকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সব সেবা সংস্থাকে নিয়ে গঠিত সমন্বয় কমিটির কার্যকর তদারকি, খাল-নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার এবং সার্বক্ষণিক নজরদারির ফলেই নগরবাসী এবার জলাবদ্ধতার বড় দুর্ভোগ থেকে মুক্ত রয়েছে।’
মেয়র বলেন, ‘জলাবদ্ধতামুক্ত চট্টগ্রাম গড়ে তোলা আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা ও প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দিন-রাত নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। খাল, নালা ও ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার রাখা, পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা দ্রুত অপসারণ এবং সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের কারণেই এবার তেমন জলাবদ্ধতা হচ্ছে না।’
সোমবার (৬ জুলাই) সকালে মেয়র নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করেন।
এ সময় তিনি বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের বাস্তব চিত্র, খাল-নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসমূহের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের অগ্রগতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। বিভিন্ন স্থানে উপস্থিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি চলমান কার্যক্রমের খোঁজখবর নেন এবং প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
মেয়র চসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আমিনকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালনা তদারকির নির্দেশ দেন।
মেয়র বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সব বিভাগ প্রস্তুত রয়েছে। কোথাও পানি জমার খবর পাওয়া মাত্র সংশ্লিষ্ট টিম দ্রুত সেখানে গিয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বজায় রাখতে আমরা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করছি।’
মেয়র আরও বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশনের উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নালা-নর্দমা, খাল কিংবা ড্রেনে ময়লা-আবর্জনা ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্য ফেলা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই পরিচ্ছন্ন নগর গড়ে তুলতে নাগরিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।’
তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখতে হবে। যেসব এলাকায় অতীতে জলাবদ্ধতার প্রবণতা ছিল, সেসব স্থানে বিশেষ নজরদারি চালানোর পাশাপাশি খাল, নালা ও ড্রেনের পানি প্রবাহ সচল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।’
পরিদর্শনের সময় মেয়র বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গেও কথা বলেন এবং তাদের কাছ থেকে পানি নিষ্কাশন পরিস্থিতি সম্পর্কে মতামত নেন। তিনি সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নগরবাসীর যে কোনো অভিযোগ বা তথ্য দ্রুত যাচাই করে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বর্ষা মৌসুমজুড়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, খাল-নালা ও ড্রেন পরিষ্কার, আবর্জনা অপসারণ এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে বিশেষ মনিটরিং অব্যাহত থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জামও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
পরিদর্শনকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা, প্রধান প্রকৌশলীসহ কর্পোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।