প্রিন্ট: ২১ মে ২০২৬, ০২:২২ পিএম
যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আরও পড়ুন
বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে ২১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। বুধবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে দুই দিনের গণশুনানির প্রথম দিন এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। পিডিবির এই প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি বলেছে, ‘পাইকারিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো না হলে এ খাতে সরকারের ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি বিদ্যুৎ খাতের ওপর চাপ তৈরি করছে।’ তবে এই প্রস্তাব প্রত্যাখান করে গ্রাহকরা বলেছেন, ‘এখন বিদ্যুতের দাম বাড়লে দেশের অর্থনীতি ধসে পড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে পোশাকশিল্প টিকে থাকতে পারবে না।’ বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন-বিইআরসি গণশুনানির আয়োজন করে। এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ।
দাম বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে গণশুনানিতে বলা হয়, ‘পিডিবি বিতরণ কোম্পানিকে গড়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করে প্রায় ১৩ টাকায়। কিন্তু বিক্রি করে ৭ টাকা ৪ পয়সা। এ কারণে সরকারের নির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে আরও ১৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা ঘাটতি আছে। তাই বিদ্যুতের দাম বাড়ানো দরকার।’
পিডিবির চেয়ারম্যান রেজাউল ইসলাম বলেন, ‘২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির পর এখনো বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। অথচ বেশি দামে কিনে কম দামে বিক্রির কারণে পিডিবির বছরে লোকসান হচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে সেই লোকসানের কত টাকা পাওয়া যাবে? সর্বোচ্চ এক-পঞ্চমাংশ। বাকি টাকা তো সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘পিডিবি সর্বোচ্চ উৎপাদন করে ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। অথচ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট। এখন বাকি বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে বসিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে।’
এই যুক্তির বিরোধিতা করে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা বলেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবে একটা কথা বারবার বলা হচ্ছে, দাম না বাড়ালে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। সরকার ভর্তুকি কোথা থেকে দেয়? ভোক্তার টাকা দিয়েই কিন্তু ভর্তুকি দেওয়া হয়। সবাই শুধু সরকারের মুনাফা নিয়েই ভাবছে, অথচ মানুষ যে মরে যাবে, তার কোনো খেয়াল নেই।’
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার অ্যাসোসিয়েশনের নেতা জামাল উদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ভালো যাচ্ছে না। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে মড়ার ঊপর খাঁড়ার ঘা হবে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়বে। বাংলাদেশ এখন পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে দ্বিতীয়। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধি এখন ধরে রাখা যাচ্ছে না। এভাবে বিদ্যুতের দাম বাড়ালে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।’
সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘এই গণশুনানির আইনগত ভিত্তি নেই। কারণ বর্তমান বাস্তবতায় দাম বাড়ানো গ্রহণযোগ্য নয়। এলপিজি, তেলের দাম বেড়েছে। এখন বিদ্যুতের দাম বাড়ালে জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়বে।’
ডেফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর জন্য গণশুনানি একটি নাটক। তাই বলতে ইচ্ছা করছে, নাটক কম করো পিও। কেননা বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস হবে। এ কারণে বিইআরসি গণশত্রুতে পরিণত হবে।’
ক্যাবের সভাপতি শফিকুজ্জামান বলেন, ‘অদক্ষতা, ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ করে সুশাসন এবং দক্ষতা বাড়ালে বিদ্যুতের খরচ অনেক কমে আসবে। তাই বিদ্যুতের দাম না বাড়িয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ এবং সুশাসন ও দক্ষতা বৃদ্ধি করুন।’
গণশুনানিতে কয়েকজন প্রতিনিধ বলেন, ‘অনেকে আগে এখানে এসে গরম গরম বক্তৃতা দিতেন। তারা এখন মন্ত্রী হয়ে গেছেন। তাহলে এতদিন বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিপক্ষে যা বলেছেন তার জন্য তো তাদের ক্ষমা চাওয়া উচিত।’ তারা বলেন, ‘কাঁচপুর থেকে সোনারগাঁও পর্যন্ত গ্যাসের অসংখ্য অবৈধ লাইন আছে। সেগুলো বন্ধ করুন। মানুষের ওপর দাম বাড়ানোর চাপ দেবেন না।’
গণশুনানির দ্বিতীয় সেশনে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ-পিজিসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রশিদ খান তার কোম্পানির সঞ্চালনের জন্য হুইলিং চার্জ বাড়ানোর দাবি জানান। তিনি বলেন, ‘পিজিসিবির কাছে এখন ৫৯ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা আছে বিভিন্ন ব্যাংক বা সংস্থার। প্রতিবছর সরকারি এই কোম্পানি লোকসান দিচ্ছে। তাই পিজিসিবির হুইলিং চার্জ বাড়াতে হবে।’
আজ বৃহস্পতিবারও পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি হবে।