• ই-পেপার

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

নওশাদ জামিল
দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীততিন ব্যক্তি একজন বয়োজ্যেষ্ঠ বাউলশিল্পীকে জোর করে ধরে তাঁর চুল-দাড়ি কেটে দিচ্ছেন। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকগুলোর হাত থেকে ছোটার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন বাউলশিল্পী।

শেষ পর্যন্ত অসহায় কণ্ঠে শুধু বলেন, ‘আল্লাহ, তুই দেহিস।’

২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এই বাউলশিল্পীর নাম হালিম উদ্দিন আকন্দ (৭০)। উপজেলার কোদালিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিনি।

হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহ পরান (রহ.)-এর ভক্ত এই বাউল। একসময় তিনি কৃষি কাজ করতেন; পরে মাজারে মাজারে থাকতেন আর মনের আনন্দে গান গাইতেন। একদিন তারাকান্দার কাশিগঞ্জ বাজারে হঠাৎ করেই তাঁকে জাপটে ধরে মেশিন দিয়ে তাঁর মাথার জট ও দাড়ি কেটে দেওয়া হচ্ছে—এ রকম একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয় এবং ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়।

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

ঢাকা : ২০২৫ সালের ৫ মে গুলশানে ভাস্কর রাসাকে রিকশা থেকে নামিয়ে গালাগাল ও হেনস্তা করা হয়

 

নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দেড় বছরের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষজনের বাসা, সংগঠন ও কর্মস্থলে ধারাবাহিকভাবে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার কথা জানা গেছে কালের কণ্ঠের অনুসন্ধানে।

মাঠ পর্যায়ের তথ্য, ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্য ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওই দেড় বছরে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের দুই হাজারের বেশি মানুষ মব সহিংসতা, হামলা, মামলা, হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। জোর করে চাকরিচ্যুতির ঘটনাও ঘটেছে। আক্রান্তদের মধ্যে রয়েছেন কবি-সাহিত্যিক-লেখক, নাট্যকর্মী, চলচ্চিত্রকর্মী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, আবৃত্তিশিল্পী, চারুশিল্পী, নৃত্যশিল্পী ইত্যাদি অঙ্গনের মানুষ। দেশের নানা প্রান্তে যাত্রা, বাউল, সুফি, পালাগান, গ্রাম থিয়েটারসহ লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত শিল্পী, কলাকুশলী ও সংগঠকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তাঁদের অনেকেই নিরাপত্তাহীনতায় কাজ বন্ধ রেখেছেন, কেউ কেউ এলাকা ছেড়েছেন, আবার কেউ নেশা-পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন।

বাউল, ফকির, সুফিদের ওপর হামলা ও অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়ার ঘটনা দেশের অধিকাংশ জেলায়ই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ বাউল সমিতি ও বাংলাদেশ সুফি জাগরণ পরিষদ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে দুই হাজারের কাছাকাছি পালাকার, বয়াতি, বাউলশিল্পী ও সংগঠক হামলা, অনুষ্ঠানে বাধার শিকার হয়েছেন। অনেক বাউলশিল্পী ও সংগঠকের নামে হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মামলাও হয়েছে।

বাংলাদেশ বাউল সমিতির মহাসচিব ও সংগঠক মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও মবের শিকার হয়েছি। মব করে দখল করা হয়েছে আমাদের বাউল সমিতির অফিস।’ তিনি আরো বলেন, ‘ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বাউলশিল্পীরা তেমন কোনো অনুষ্ঠান করতে পারেননি। অল্প কিছু অনুষ্ঠান হলেও হামলা ও ভয়ভীতি দেখিয়ে বন্ধ করা হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কিভাবে দেশের শিল্প-সংস্কৃতি বাধার মুখে পড়েছে, জাতীয় সংসদে বীর মুক্তিযোদ্ধা এমপি ফজলুর রহমানের বক্তব্যে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদে তিনি বলেছেন, ‘৫ আগস্টের পর কী হলো—আপনারা জানেন। এখানে ইউনূস সরকার ছিল। আমি শিল্পকলা একাডেমির সামনে থাকি। একটা গান হইতে পারে নাই, একটা নাটক হইতে পারে নাই, একটা লালনের গীতি হইতে পারে নাই, একটা বাউল গান হইতে পারে নাই—সবকিছু কালো শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছিল।’

ক্ষমতায় থাকাকালে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা কখনোই মব ঠেকাতে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নেননি। তবে গত ৫ এপ্রিল বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অন্তর্বর্তী সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল স্বীকার করে নিয়েছেন, ‘মব ঠেকানোর ক্ষেত্রে দৃঢ়তা দেখাতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি।’

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

মানিকগঞ্জ : ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর বাউলদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে আক্রমণ করে ‘তৌহিদি জনতা’

 

লোকশিল্পীদের ওপর হামলা, অনুষ্ঠানে বাধা

২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জে বাউলদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে তৌহিদি জনতার ব্যানারে আক্রমণ করা হয়। সেখানে ১০ জন বাউলশিল্পীকে বেদম পেটানো হয়। মারাত্মকভাবে আহত হন বাউলশিল্পী আবদুল আলীম, আরিফুল ইসলাম, জহিরুল ইসলাম প্রমুখ।

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

ঠাকুরগাঁও : ২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর শহরের চৌরাস্তা মোড়ে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলা ও মারধর

২০২৫ সালের ২৬ নভেম্বর ‘সম্প্রীতির ঐক্য, ঠাকুরগাঁও’ ব্যানারে শহরের চৌরাস্তা মোড়ে বাউলশিল্পীদের প্রতিবাদ সমাবেশ হওয়ার কথা ছিল। সেখানে প্রকাশ্যে বাউলরা মারধর ও হামলার শিকার হন।

বাউলশিল্পী ও সংগঠক রাজু সরকার বলেন, ইউনূসের আমলে সারা দেশে বাউল-ফকিররা অপদস্থ, হেনস্তার শিকার হয়েছেন। এ সময় তাঁরা তেমন কোনো অনুষ্ঠানেও যেতে পারেননি, গান গাইতে পারেননি। সারা দেশেই বাউলশিল্পীরা ভয় ও আতঙ্কে ছিলেন।

বাউল ও পালাশিল্পীদের একটি বড় অংশ মাজার ঘরানার। তাঁরা মাজারে ওরস বা মাহফিলে গান করেন, বিভিন্ন মেলা-পার্বণে অংশ নেন। ইউনূসের শাসনামলে দেশের শতাধিক মাজারে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ সময় অনেক জায়গায় হামলার শিকার হন বাউলশিল্পীরাও।

লোকসংস্কৃতি গবেষক আমিনুর রহমান সুলতান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাউল, পালাগান, লালনের গান, মাজারকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার চর্চা আমাদের সমাজের বৈচিত্র্য, মানবিকতা, সহিষ্ণুতা ও সমন্বয়ের ধারাকে বহন করে। দুঃখের বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাটি নানাভাবে আক্রান্ত হয়।’

 

মঞ্চনাটক, গ্রাম থিয়েটারকর্মীরা আক্রান্ত

স্বাধীনতার পর আধুনিক নাট্য-আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা থিয়েটার’ উপহার দিয়েছে কালজয়ী নাটক ও অনেক শিল্পী-কলাকুশলী। চলচ্চিত্র নির্মাণেও রেখেছেন অবদান, যা দর্শকদের প্রশংসা কুড়িয়েছে। পেয়েছেন একুশে পদক, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে জাতীয় পুরস্কারসহ অনেক পদক ও সম্মাননা। এই গুণী মানুষটির নাম নাসির উদ্দীন ইউসুফ। এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকেও আসামি করা হয়েছে হত্যা মামলার।

নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীতে ছাত্র-জনতার ওপর আমি নাকি গুলি চালিয়েছি, মানুষ হত্যা করেছি! অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি চর্চাকে ব্যাহত করার উদ্দেশ্যেই মামলায় আমার নাম দেওয়া হয়েছে বলে মনে করি।’

দেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে আরেক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, নাট্যকার, নির্দেশক, সংগঠক মামুনুর রশীদও হেনস্তার শিকার হন। ২০২৪ সালের ৮ নভেম্বর শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালার সামনে গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের এক অনুষ্ঠানে হামলা করে দুর্বৃত্তরা। বিকেল ৪টার পর সমাবেশে মামুনুর রশীদের বক্তব্যের সময় কিছু লোক ডিম ছুড়ে মারে, নাট্যকর্মীদের ওপর হামলে পড়ে। পরে শিল্পকলা একাডেমিতে মামুনুর রশীদকে নাটকে অভিনয় না করার অনুরোধ করেন সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ জামিল আহমেদ।

মামুনুর রশীদ বলেন, ‘শিল্পকলার সাবেক ডিজি ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন, আমি যাতে শিল্পকলায় অভিনয় না করি। কারণ হিসেবে তিনি ছাত্র আন্দোলনের সময় দেওয়া ২৪ জন বিশিষ্টজনের একটি বিবৃতির কথা জানান। রাজাকার স্লোগান নিয়ে ২৪ জন বিশিষ্টজন বিবৃতি দিয়েছিলেন, সেখানে আমার নাম ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ওই বিবৃতিতে কী অপরাধ আছে? অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে একটি মহল বিভিন্নভাবে চষ্টা করেছিল দেশে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চা বন্ধ হয়ে যাক।’

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ থিয়েটারের সভাপতির বসতবাড়িতে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি থিয়েটারের সভাপতি ও সংগঠক হাবিবুর রহমান হাবিবের বাড়ি, জামালপুরের মেলান্দহে শহীদ সমর থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও নাট্যকার আসাদুল্লাহ ফারাজীর বাড়িও ভাঙচুর করা হয়। তাঁদের নামে একাধিক মামলাও করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগ করে বর্তমানে জামিনে আছেন গ্রাম থিয়েটারের অন্যতম এই দুই সংগঠক।

 

রুপালি পর্দার তারকারাও আক্রান্ত

চলচ্চিত্রে জনপ্রিয় মুখ নুসরাত ফারিয়া। বাংলাদেশ ও ভারতে একাধিক জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। পেয়েছেন খ্যাতি ও ব্যাপক পরিচিতি। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনীনির্ভর ‘মুজিব : একটি জাতির রূপকার’ চলচ্চিত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নুসরাত ফারিয়া। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর হত্যা মামলার আসামি করা হয় এই অভিনেত্রীকে। ২০২৫ সালের ১৮ মে গ্রেপ্তার হন ফারিয়া। তাঁকে ভাটারা থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান।

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

 

ঢাকা : ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে কাকরাইলে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়

 

টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে পরিচিত মুখ কমেডি অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিককে ২০২৫ সালের ২৯ এপ্রিল বিকেলে কাকরাইল এলাকায় মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। সংগৃহীত ভিডিওতে দেখা যায়, জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় তাঁকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে একদল যুবক। কেউ একজন তাঁর গায়ে হাত তুলছিল। জামাকাপড় ছেঁড়া অবস্থায় রাস্তায় হাঁটিয়ে নিয়ে সিদ্দিককে সেদিন রমনা থানা-পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। পরে গুলশান থানায় জুলাই আন্দোলনে ছাত্র হত্যাচেষ্টা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১১ মাস কারাভোগ করে সমপ্রতি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এই অভিনেতা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শতাধিক চলচ্চিত্র অভিনেতা-অভিনেত্রী, প্রযোজক, পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। হত্যা বা হত্যাচেষ্টার মামলা হওয়ায় তাঁদের অনেকেই এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। ফেরদৌস আহমেদ, রিয়াজ, চঞ্চল চৌধুরী, শমী কায়সার, অপু বিশ্বাস, নিপুণ আক্তার, শামীমা তুষ্টি, সৈয়দা কামরুন নাহার শাহনূর, উর্মিলা শ্রাবন্তী কর, সোহানা সাবা, তানভীন সুইটি, মেহের আফরোজ শাওন, জাকিয়া মুন, জ্যোতিকা জ্যোতি, সুবর্ণা মুস্তাফা, আজিজুল হাকিম, আশনা হাবিব ভাবনা, সায়মন সাদিক, জায়েদ খান, রোকেয়া প্রাচী, তারিন জাহান, অরুণা বিশ্বাস, ইরেশ যাকের, সাজু খাদেম প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা হয় ওই সময়।

তবে এঁদের অনেকের কর্মকাণ্ডই শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার ইন্ধন জুগিয়েছে বলে অভিযোগ ছিল।

 

চারুকলা শিল্পীদের হেনস্তা

২০২৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের এক অনুষ্ঠানে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন প্রখ্যাত শিল্পী ও ‘টোকাই’ চরিত্রের স্রষ্টা রফিকুন নবী। সেদিন অঙ্কন ও চিত্রায়ণ বিভাগের বার্ষিক শিল্পকর্ম প্রদর্শনী-২০২৪-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তিনি। দুপুরে অনুষদে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের শিল্পকর্ম ঘুরে দেখেন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন রফিকুন নবী। তবে পরে আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাঁকে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করার অনুরোধ জানানো হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তাঁর ওপর মব হামলার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় আয়োজকরা নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই এমন সিদ্ধান্ত নেন। ঘটনাটি চারুকলা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

একই বছরের ৫ মে রাজধানীর গুলশানে হেনস্তার শিকার হন ভাস্কর রাসা। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে।

ভিডিওতে দেখা যায়, এক যুবক রিকশা থামিয়ে ভাস্কর রাসাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনার নামে মামলা হয় নাই? আপনি কই যান? গুলশান থানায় চলেন।’ এ সময় তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালাগালও করা হয়। এক পর্যায়ে পেছন থেকে ধাক্কা ও লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটে।

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

 

তারাকান্দা : ২০২৫ সালে ময়মনসিংহের তারাকান্দায় বাউলশিল্পী হালিম উদ্দিন আকন্দের মাথার চুল ও দাড়ি কর্তন 

 

সূত্র জানায়, সেদিন সন্ধ্যায় ভাস্কর রাসা রিকশায় করে গুলশানের সাজু আর্ট গ্যালারিতে যাচ্ছিলেন। গুলশান-১ ও গুলশান-২-এর মাঝামাঝি এলাকায় এক যুবক তারা রিকশা থামিয়ে তর্কে জড়ান। পরে আরো দুই-তিনজন সেখানে জড়ো হয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে ভাস্কর রাসা দ্রুত রাস্তা পার হয়ে সেখান থেকে সরে যান। তখন পেছন থেকে তাঁকে আঘাত করা হয় বলেও জানা গেছে।

 

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট নেতারাও আক্রান্ত

দেশের সংস্কৃতি অঙ্গনের প্রায় দেড় শ সংগঠনের প্ল্যাটফর্ম ‘সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট’। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই জোটের অধিকাংশ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হত্যা কিংবা হত্যাচষ্টোর মামলা রয়েছে। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে মব হামলার শিকার হয়েছেন। জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ অনেক দিন ধরেই আত্মগোপনে আছেন। সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ মব আক্রমণ ও মামলা থেকে রক্ষা পেতে বিদেশে আশ্রয় নিয়েছেন।

হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করলে আবৃত্তিশিল্পী ও জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইউনূস আমল দেশের শিল্প-সংস্কৃতির জন্য অন্ধকার যুগ ছিল। সাংস্কৃতিক কর্মী ও সংগঠকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। মামলা ও হামলার শিকার হয়েছেন অনেকেই। আমার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়েছে। মব আক্রমণ ও হত্যার হুমকি পেয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছি।’

মুক্তধারা আবৃত্তি চর্চাকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ও আবৃত্তিশিল্পী মহিউদ্দিন শামীম কালের কণ্ঠকে জানান, সারা দেশে আবৃত্তিশিল্পীরাও হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন। আবৃত্তিশিল্পী আহসান উল্লাহ, মনির হোসেন, শামীম আরা রত্না, ইমদাদ হোসেন কৈশোর, মাহবুবুর রহমান মাহফুজ, শামসু মিঠু, জালাল উদ্দিন হিরা, বশির দুলাল প্রমুখের নামা মামলা হয়েছে।

দুই হাজার শিল্পী নিগৃহীত

ঢাকা : ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মারধরের শিকার হন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব

 

কথাশিল্পীরাও হামলা-মামলার শিকার

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পরই ৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট সরকারি ছুটি বাতিল করে। এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ক্রিয়েটিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন নামের একটি সংগঠন মানববন্ধন আয়োজন করে। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় অর্ধশত কবি-সাহিত্যিক ও লিটলম্যাগ কর্মী। সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায় কয়েক শ মানুষ। দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা দিয়ে তাঁদের প্রায় সবাইকে বেদম প্রহার করা হয়।

কালের কণ্ঠ সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, সেদিন প্রেস ক্লাবের সামনে হামলায় গুরুতর আহত হন কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব। তাঁকে রাস্তায় ফেলে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এ ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে শারীরিক ও মানসিক আঘাত পান। চিকিৎসা নেন কয়েকটি হাসপাতালে, তবে পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি। মাস ছয় পরে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল অসুস্থ অবস্থায় মারা যান এই কবি ও সাংবাদিক।

সেদিন হামলায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন সংগঠনটির মুখপাত্র কবি কুতুব হিলালী। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, “সেদিন আমাদের ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ আখ্যা দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। আমরা কোনো রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত না। আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করা একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার ওপর আঘাতের প্রতিবাদে আমরা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম।”

কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে সুপরিচিত সোহেল হাসান গালিব। পেশায় তিনি বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা ও একটি সরকারি কলেজের অধ্যাপক। প্রকাশিত একটি বই ও কবিতায় ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৫ সালে মামলা করা হয়। প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘদিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেলেও এখনো কাজে যোগদান করতে পারেননি।

চারুলিপি প্রকাশনের প্রধান প্রকাশক হুমায়ুন কবীরকে ২০২৫ সালের ১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করা হয়। কালের কণ্ঠকে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কোথাও কোনো মামলা ছিল না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ছবি থাকা এবং তাঁর বই প্রকাশ করার কারণে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ৭১ দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছি।’

এ ছাড়া কবি কামাল চৌধুরী, কবি মোহাম্মদ সাদিক, কবি তারিক সুজাত, লেখক রাখাল রাহা, প্রকাশক ওসমান গনি, প্রকাশক আফজাল হোসেন প্রমুখের নামে মামলা হয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বেগম রোকেয়াসহ অনেক কবি-সাহিত্যিকের স্মৃতিচিহ্ন, ভাস্কর্য, ম্যুরাল, গ্রাফিতি অবমাননা ও ভাঙচুর করা হয়।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি ও পরে এক দফার সরকারবিরোধী গণ-আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ও ব্যান্ড জলের গান-এর প্রধান রাহুল আনন্দ। তবু এই শিল্পী রক্ষা পাননি মব সহিংসতা থেকে। হাসিনা সরকারের পতনের দিনই রাহুল আনন্দর ধানমণ্ডির বাসভবনে চালানো হয় হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। গোটা বাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। শিল্পীর তিন শতাধিক বাদ্যযন্ত্র, স্টুডিও রক্ষা পায় না ভাঙচুর, আগুন থেকে। লেপ-তোষক, এসি থেকে শুরু করে সবকিছু খুলে নিয়ে যায় লুটপাটকারীরা। সেদিন প্রাণ বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে বাসা ছাড়তে বাধ্য হন রাহুল। পরে নিঃস্ব অবস্থায় দেশ ছাড়েন এই শিল্পী।

কারা হামলা করেছে

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সারা দেশে বাউল, লোকশিল্পী ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনাগুলোর পেছনে একই ধরনের সংগঠিত চক্রের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত মিলেছে। অধিকাংশ হামলাকারী ‘তৌহিদী জনতা’ ব্যানার ব্যবহার করে মাঠে নামে। তবে তাদের অধিকাংশই বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মানিকগঞ্জে বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের মধ্যে কয়েকজনের পরিচয় এরই মধ্যে শনাক্ত হয়েছে। ভিডিও ফুটেজ ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, হামলায় নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে সাবিদ সাদী নামের এক ব্যক্তিকে। ৫ আগস্টের পর তিনি হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছে। হামলার সময় তাঁকে মাইক হাতে বাউলদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক ঘোষণা দিতে দেখা যায়। আরেকজন শনাক্ত ব্যক্তি হলেন মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বরংগোখোলা গ্রামের হেফাজতে ইসলামের কর্মী আবদুল আলিম। স্থানীয় সূত্র জানায়, হামলার সময় তিনি আহতও হন।

মানিকগঞ্জের একাধিক সূত্র বলছে, হামলায় অংশ নেওয়া অনেকেই স্থানীয় পরিচিত মুখ ছিল না। তাদের বড় অংশ বিভিন্ন মাদরাসার ছাত্র। অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মুফতি সাঈদ নূর পরিচালিত সদর উপজেলার মিতরা গ্রামের নূরে কোরআন মাদরাসা থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্র ওই মিছিলে অংশ নেয়।

এ ছাড়া হামলার উসকানি ও সংগঠনে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে আরো কয়েকজনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে যাঁদের নাম উঠে এসেছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুফতি ওবায়দুল্লাহ, মুফতি মজিবুর রহমান, মাওলানা মাহাবুবুর রহমান, মাওলানা আশিকুল ইসলাম ছানোয়ার, আবদুল হান্নান, মুফতি আবদুল আল ফিরোজ, কারি সোহায়েল ও মুফতি আবদুল করিম কাসেমী। স্থানীয়দের দাবি, তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

শুধু মানিকগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ব্যানারে বাউলশিল্পী, মাজার ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন সূত্র বলছে, শতাধিক মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে। হামলা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানেও।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ মনে করেন, শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ওপর হামলাগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের নীরব পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ভয় ও অস্থিরতা তৈরি করতে চেয়েছে। একই সঙ্গে শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের মানুষের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করার চেষ্টাও ছিল এসব হামলার পেছনে।

নাট্যজন নাসির উদ্দীন ইউসুফও এসব ঘটনাকে পরিকল্পিত বলে মনে করেন। তিনি বলেন, শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের কোনো ব্যক্তি জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ড বা নাশকতার সঙ্গে জড়িত নন। তার পরও অসংখ্য সাংস্কৃতিক কর্মী হামলা, মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

নাসির উদ্দীন ইউসুফের মতে, সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এসব ঘটনা ঘটানো হয়েছে। সংস্কৃতিচর্চা সব সময়ই সমাজে সহনশীলতা, মানবিকতা ও মুক্তচিন্তার চর্চা বাড়ায়। আর সেই জায়গাটিকেই দুর্বল করার চেষ্টা করেছে একটি উগ্র গোষ্ঠী।

আবৃত্তিশিল্পী ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহর নামে একাধিক হত্যা মামলা রয়েছে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, দেশের শিল্প-সংস্কৃতি অঙ্গনের অধিকাংশ মানুষই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দেশপ্রেম এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধ চর্চা করতে গিয়ে তাঁদের কেউ কেউ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন। তিনি বলেন, ‘রাজনীতি করা তো অন্যায় বা অসাংবিধানিক কিছু নয়। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের ওপর হামলা, হুমকিসহ হত্যা বা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।’

তিনি দাবি করেন, ‘সাংস্কৃতিক অঙ্গনের যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে বা যাঁরা হামলার শিকার হয়েছেন, আমি হলফ করে বলতে পারি, তাঁদের কেউই জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন।’

 

উক্তি

উক্তি

ক্রিকেটের বড় দুই নাম সাকিব-মাশরাফির বিরুদ্ধে হত্যা মামলাগুলোর কোনো যুক্তি নেই। তবে তাঁদের নিজেদেরই ফিরতে হবে।

ইশরাক হোসেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী

অপুষ্ট শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে, হামে আরো ৫ মৃত্যু

নিজস্ব প্রতিবেদক
অপুষ্ট শিশুরাই বেশি ঝুঁকিতে, হামে আরো ৫ মৃত্যু
সাত মাস বয়সী শিশু আবু তালহা হামে আক্রান্ত। শিশু হাসপাতালে চলছে তার চিকিৎসা। গতকাল তোলা। ছবি : লুৎফর রহমান

দেশে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের ঘাটতি ও অপুষ্টির কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে শিশুরা। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময় এক হাজার ৪০৫ শিশু হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে। তাদের মধ্যে এক হাজার ১৮৭ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা  হয়েছে। নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ১১১ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত বুলেটিনে জানানো হয়েছে, গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে ৭৫ জন। এ ছাড়া হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে আরো ৩৮৯ জনের।

এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে হাসপাতালে এসেছে ৫৪ হাজার ৯১১ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৮৬৮ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৩৮ হাজার ৯৮০ জন। মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাত হাজার ৮৫৬ জনে।

হাম পরিস্থিতি নিয়ে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, দেশে হামের সংক্রমণ এখনো ঊর্ধ্বমুখী। গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৫১ জন রোগী। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০০ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক শিশু আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আসছে। ভর্তি হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে অপুষ্টি বড় কারণ। সুপুষ্ট শিশুরা আক্রান্ত হলেও দ্রুত সুস্থ হয়ে যাচ্ছে।

টিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোনো টিকাই শতভাগ সুরক্ষা দেয় না। তবে টিকা নেওয়া থাকলে রোগের তীব্রতা, নিউমোনিয়া ও গুরুতর ডায়রিয়ার মতো জটিলতা অনেক কমে যায়।

এদিকে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত বাংলাদেশে হামের পুনরুত্থান : আজকের সংক্রমণ ও আগামী দিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কভিড-১৯ মহামারির পর নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, টিকা নিতে অনীহা এবং অপুষ্টির কারণে দেশে আবারও হামের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে।

শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. জেসমিন মোর্শেদ বলেন, হাম সম্পূর্ণ প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও টিকা কাভারেজের ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ও সময়মতো চিকিৎসাই হাম নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়।

ভাইরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. শারমিন সুলতানা বলেন, টিকা কার্যক্রমে ঘাটতির কারণে সমাজে হার্ড ইমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, হাম শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়। এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, এমনকি দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতাও তৈরি হতে পারে। অপুষ্ট শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

ভাইরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এস এম রাশেদ উল ইসলাম বলেন, আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশ নিউমোনিয়ায় এবং ২৯ থেকে ৩৮ শতাংশ ডায়রিয়ায় ভুগছে। এ ছাড়া এনসেফালাইটিস, কানের সংক্রমণ ও ভিটামিন ঘাটতিজনিত অন্ধত্বের ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে টিকা নেওয়া শিশুদের রোগ তুলনামূলকভাবে হালকা।

সেমিনারে বক্তারা হাম প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার, শিশুদের ভিটামিন ক্যাপসুল নিশ্চিত করা, মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো এবং অপুষ্টি দূরীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

সন্তানহারা পিতার কাঁধে এখন ঋণের ভার

হাম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়

শিমুল মাহমুদ
সন্তানহারা পিতার কাঁধে এখন ঋণের ভার

আমি নিঃস্ব হয়ে গেছি ভাই। চিকিৎসা করাতে গিয়ে লাখ টাকার বেশি ঋণ হয়েছে। আমার আদরের মেয়ে জান্নাতকেও বাঁচাতে পারলাম না।

কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের বাসিন্দা মোহাম্মদ নোমান। পেশায় তিনি একজন বুটিক কারিগর। হাম কেড়ে নিয়েছে তাঁর একমাত্র সন্তানকে। শোকের জগদ্দল ভারের সঙ্গে এখন তাঁর জীবনে যোগ হয়েছে ঋণের ভারও।

গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে নোমান জানান, মেয়েকে বাঁচাতে যা ছিল সব খরচ করেছেন। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, পরিচিত মানুষসবার কাছেই হাত পাততে হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সন্তানকে বাঁচানো যায়নি।

আট মাস পূর্ণ হওয়ার ঠিক এক দিন আগে গত ১৩ মে বিকেল ৪টায় ঢাকার মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে মারা যায় নোমানের একমাত্র মেয়ে জান্নাত। হামে আক্রান্ত হওয়ার পর জান্নাত নিউমোনিয়ার জটিলতায় ভুগছিল।

নোমান বলেন, মেয়েটা অসুস্থ হওয়ার পর প্রথমে স্থানীয় ডাক্তার দেখাই। পরে অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নিই। একটার পর একটা পরীক্ষা, ওষুধ, হাসপাতালের খরচসব মিলিয়ে এখন আমি লাখ টাকার বেশি ঋণে পড়েছি।

রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আরেক শিশু তাসমিদের বাবা মো. নয়নও একইভাবে ভেঙে পড়েছেন। সামান্য বেতনে চাকরি করা এই বাবা সন্তানের চিকিৎসার জন্য আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশীএমনকি স্থানীয় দোকানদারের কাছেও ধার করেছেন।

তিনি বলেন, হাসপাতালে যাতায়াত, ওষুধ, পরীক্ষা আর খাবারের খরচ মিলিয়ে কয়েক দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টাকা ঋণ হয়েছে। আরো টাকার জন্য মানুষের কাছে হাত পাতছি। কিন্তু এর মধ্যেই আমার প্রিয় তাসমিদ চলে গেল। নয়ন বলেন, কোনোমতে সংসার চলত। এখন ঋণের চাপে কী করব বুঝতেছি না।

হামে মারা যাওয়া অন্তত ১০টি শিশুর পরিবারের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানা গেছে। বেশির ভাগ পরিবারই নিম্ন আয়ের। সন্তানকে বাঁচাতে কেউ গয়না বিক্রি করেছেন, কেউ আত্মীয়-স্বজন বা এনজিও থেকে ঋণ নিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, দরিদ্র পরিবারের জন্য বড় অর্থনৈতিক সংকটও তৈরি করছে। একটি শিশু আক্রান্ত হলে পুরো পরিবারের আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে হয়, বাড়ে ওষুধ, পরীক্ষা ও পুষ্টিকর খাবারের খরচ।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, চিকিৎসা খরচের এই আতঙ্কে অনেক গরিব মানুষ তাদের অসুস্থ শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। তাঁরা ভাবছেন, হয়তো এমনিতেই সেরে যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়, তখন তাঁরা ভিটামাটি বা ঘটি-বাটি বিক্রি করে সর্বস্বান্ত হয়ে হাসপাতালের দিকে ছোটেন। এভাবে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে আমাদের দেশের নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো আজ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এবং গ্রাম থেকে দারিদ্র্য বাড়ার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এই উচ্চ স্বাস্থ্য ব্যয়।

তিনি আরো বলেন, ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার জন্য প্রাথমিক ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে নিশ্চিত করতে হবে। যাঁরা এই মহামারিতে প্রিয়জন হারিয়েছেন কিংবা সর্বস্বান্ত হয়েছেন, সরকারকে তাঁদের পাশে দাঁড়াতে হবে এবং সামাজিক ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে। হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পর রোগীদের ফলোআপ চিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র যেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেওয়া হয়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে এমন একটি টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে চিকিৎসার প্রতিটি খরচ সরকার বহন করবে। আমরা চাই এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যেখানে অর্থের অভাবে কোনো শিশুকে বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মরতে হবে না।

হামের চিকিৎসায় কত খরচ? : হামের চিকিৎসায় গড় ব্যয় নিয়ে এখনো কোনো সরকারি গবেষণা নেই। তবে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া শিশুর অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালের সাধারণ শয্যায় চিকিৎসা নিতে গড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। জটিলতা থাকলে তা ৫০ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এই খরচের মধ্যে রয়েছে যাতায়াত, খাবার, স্থানীয় চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওষুধের ব্যয়।

অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গড়ে ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হচ্ছে। কোনো শিশুর পিআইসিইউ প্রয়োজন হলে খরচ তিন লাখ টাকারও বেশি হচ্ছে।

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আট মাস বয়সী রাফসানের বাবা স্বপন খান জানান, সন্তানের চিকিৎসায় তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার টাকা। এই টাকা তিনি কৃষি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন।

পটুয়াখালীর ঝাউফল এলাকার বাসিন্দা স্বপন বলেন, পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় আসতেই চার হাজার টাকা গেছে। ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল ঘুরে আরো দেড় হাজার টাকা খরচ। হাসপাতালে আসার আগে প্রাইভেট চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আট হাজার টাকা গেছে। স্থানীয় হাসপাতালে আরো ১৬ হাজার টাকা খরচ করেছি।

তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তির পর বেশির ভাগ ওষুধ সরকার থেকে পেলেও কিছু পরীক্ষা বাইরে থেকে করাতে হয়েছে। ব্লাড সিরাম ফেরিটিন, হিমোগ্লোবিন ই পরীক্ষা, হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস, ব্লাড সিরাম টিআইবিসিএসব পরীক্ষার পেছনেও খরচ হয়েছে। স্বপন খান বলেন, ঋণ কেমনে শোধ করমু জানি না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমার ছেলেটা এখনো বেঁচে আছে!

ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. আসিফ হায়দার বলেন, বর্তমানে হাসপাতালের প্রায় ৯০ শতাংশ পরীক্ষা সরকারি খরচে করা হচ্ছে। এ ছাড়া আইজিএম পরীক্ষার মতো বিশেষ পরীক্ষাও বিনামূল্যে করানো হচ্ছে।

তিনি জানান, মেরোপেনেম বা ভ্যানকোমাইসিনের মতো উচ্চমূল্যের অ্যান্টিবায়োটিক সরকার থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে। শিশুদের জন্য প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার, ডিম ও গুরুতর অসুস্থদের বিশেষ ডায়েটও দেওয়া হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করেন, ঢাকার বাইরে থেকে অনেক শিশু অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় আসছে। অপুষ্ট শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

শিশু হাসপাতালেও খরচ দ্বিগুণ : বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি শিশুদের কয়েকজন অভিভাবক জানান, এক সপ্তাহে তাঁদের খরচ ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। তাঁরা জানিয়েছেন, বিভিন্ন পরীক্ষা, ইনজেকশন, স্যালাইন, ভিটামিন সাপ্লিমেন্টসহ প্রয়োজনীয় অনেক কিছু বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

বরিশাল থেকে অসুস্থ শিশু আলিফকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন জুয়েল-তন্বী দম্পতি। তিন দিন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার পর অবস্থার অবনতি হলে তাঁরা রাজধানীতে আসেন। পেশায় গাড়িচালক জুয়েল বেপারী বলেন, বাচ্চা অসুস্থ হওয়ার আগেই চাকরি হারাইছি। ঢাকায় এসে কয়েকটা হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে পারিনি। পরে শিশু হাসপাতালের বারান্দায় অপেক্ষা করছি। বেড খালি হলে ভর্তি করাতে পেরেছি। তিনি জানান, আগে মাসে ২৩ হাজার টাকা বেতন পেতেন। এখন ধারদেনা করে সন্তানের চিকিৎসা চালাতে হচ্ছে।

জুয়েল বলেন, একটা বেসরকারি হাসপাতালে মাত্র এক ঘণ্টা ছিলাম। সেখানেই ১৩ হাজার টাকা বিল আসে। টাকা না থাকায় চলে আসি। চার দিন ধরে শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে আলিফ। জুয়েলের ভাষায়, বরিশাল আর ঢাকা মিলিয়ে এক সপ্তাহে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার করে চলতেছি। কিন্তু এভাবে আর বেশিদিন পারব না।

বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. মো. আতিকুল ইসলাম বলেন, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে কমপ্লিকেটেড মিজলস বা হাম-পরবর্তী জটিলতা। তিনি বলেন, শিশুরা এখন শুধু হাম নিয়ে আসছে না; তারা নিউমোনিয়া, তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে আসছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত ভর্তি রাখতে হচ্ছে।

তিনি জানান, গুরুতর রোগীদের জন্য ১৪ বেডের বিশেষায়িত আইসিইউ চালু করা হয়েছে, যা সব সময় পূর্ণ থাকছে। ডা. আতিকুল বলেন, জেলা পর্যায়ে আইসিইউর সংকট থাকায় রোগীরা ঢাকায় আসছে। সময়মতো আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সাপোর্ট পেলে অনেক মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতো।

বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক গুণ বেশি ব্যয় : অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালে জায়গা না পেয়ে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে গেলে অল্প সময়েই কয়েক গুণ বেশি খরচ হয়ে যাচ্ছে। হামে আক্রান্ত ১১ মাস বয়সী কন্যা আরশিয়াতুল ইনায়া আয়াতকে নিয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন পলাশ মিয়া। তিনি বলেন, কেবিন ভাড়া দৈনিক আড়াই হাজার টাকা। এর বাইরে অক্সিজেন, ওষুধ, ডাক্তার ফিসব মিলিয়ে আড়াই লাখ টাকার মতো খরচ হতে পারে বলেছেন ডাক্তার। একজন চিকিৎসক জানান, বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে একটি শিশুকে রাখলে প্রতিদিন ২৫ হাজার টাকার বেশি বিল আসতে পারে, যা বেশির ভাগ পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়।

বদলাতে পারে র‌্যাবের নাম : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জবাবদিহিমূলক এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
জবাবদিহিমূলক এলিট ফোর্স গঠনে নতুন আইন হচ্ছে
সালাহউদ্দিন আহমদ

পুলিশের এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব পরিচালনায় নতুন আইন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, আগামী দিনে মানবাধিকার সমুন্নত রেখে এই এলিট ফোর্স তার সব কার্যক্রম পরিচালনা করবে। এ জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই বাহিনীর নামও পরিবর্তন হতে পারে। 

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর কুর্মিটোলায়  র‌্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময়সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য, পলিসি ও স্ট্র্যাটেজি এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন তিন বাহিনীর প্রধানরা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তর-সংস্থার প্রধানরাসহ বিভিন্ন সামরিক-অসামরিক কর্মকর্তারা।

অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির। স্বাগত বক্তব্য দেন র‌্যাবের মহাপরিচালক মো. আহসান হাবীব পলাশ। বর্তমানে র‌্যাব আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের কিছু ধারার অধীনে পরিচালিত হচ্ছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি দীর্ঘদিন ধরে অ্যাডহক ভিত্তিতে চলেছে। একটি বাহিনী এভাবে পরিচালিত হওয়া ঠিক নয়। তাই এখন আমরা একটা আইন করব আলাদা এলিট ফোর্সের জন্য, এখানে অথরিটি দেওয়া থাকবে, তাদের রেসপনসিবিলিটি সুনির্দিষ্ট করা থাকবে এবং তার ভিত্তিতে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। এটা এখনো ডিটেইল বলার সময় আসেনি।

র‌্যাব থাকছে কি থাকছে নাএমন প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমরা একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছি। নতুন আইনে নতুন একটি এলিট ফোর্স গঠনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে সরকার। যে আইনের অধীনে এলিট ফোর্স হিসেবে একটি বাহিনী থাকবে। আমরা র‌্যাবের নাম পরিবর্তন করব কিনা বা অন্য নতুন এলিট ফোর্স আমরা গঠন করব কি না, সেটা এখনো চিন্তা-ভাবনার বিষয়। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত নিয়ন্ত্রণ ও স্বাভাবিক রাখতে একটি এলিট ফোর্সের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সে বিবেচনায় র‌্যাবের বিদ্যমান আইন পরিবর্তন ও সংশোধনপূর্বক এটিকে যুগোপযোগী ও বিশ্বমানের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; যাতে করে এলিট ফোর্সটির সদস্যদের পেশাদারির পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যায়। র‌্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমেরিকা যখন র‌্যাবের ওপর স্যাংশন দিয়েছিল তখন র‌্যাব রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, কিছু প্রশ্নবিদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল। ফ্যাসিবাদী সরকার তাদের একদলীয় শাসন কায়েমের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। সে কারণেই র‌্যাবের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, যা এখনো বহাল রয়েছে। তিনি বলেন, সেই সময় ফ্যাসিবাদী সরকারের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য, একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করার জন্য এই জাতীয় অনেক প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। কিন্তু আমরা যদি এলিট ফোর্স হিসেবে একটা নতুন ফোর্স  রিনেম (নাম পরিবর্তন) করি বা পুনর্গঠন করি, সেখানে হয়তো তাঁরা বিষয়ট পুনর্বিবেচনা করবেন। সেটা আশা করা যায়, তবে এখনো অনেক কিছু বাকি আছে...দেখা যাক।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এমন কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না, যেটা ফ্যাসিস্ট শাসনামলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সেটা পুলিশ, সেনাবাহিনী, র‌্যাব, বিজিবি সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের স্মরণ রাখতে হবে কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের দায় পুরো  প্রতিষ্ঠান নিতে পারে না। যার যার প্রতিষ্ঠানের আইনে এবং প্রচলিত আইনের সব কর্মকর্তাকে অ্যাকাউন্টেবল করার জন্য আমরা অলরেডি অনুশাসন দিয়েছে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এলিট ফোর্স হিসেবে নতুন কিছু গড়ে তোলা সম্ভব হলে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র পুনর্বিবেচনা করবে বলে বিশ্বাস করি। র‌্যাবকে ফের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হবে কি না প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের গেল কয়েক মাসের কাজের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, মর্নিং শোজ দ্য ডে। তিন মাস হয়ে গেল। এর মধ্যে পুলিশ কি ব্যবহৃত হয়েছে? র‌্যাব কি ব্যবহৃত হয়েছে, পলিটিক্যাল উদ্দেশে অন্য কোনো বাহিনী কি ব্যবহৃত হয়েছে? সুতরাং মর্নিং শোজ দ্য ডে। প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজস্ব সুনাম ও গৌরব বজায় রেখে কাজ করে যেতে হবে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারের কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থাকবে না। বিশ্বের কাছে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠা করতে হবে যে বাংলাদেশের সব প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি রয়েছে। এর মাধ্যমে আমরা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই।

প্রসঙ্গত, বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে জঙ্গিবাদের উত্থান ও আইন-শৃঙ্খলার ক্রমাগত অবনতির মধ্যে ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, আনসার ও ভিডিপি, বিজিবি ও কোস্ট গার্ড সদস্যদের নিয়ে র‌্যাব গঠিত হয়। পরে ক্রসফায়ারবন্দুকযুদ্ধের নামে শত শত বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ওঠে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। বিএনপির পর আওয়ামী লীগের সময়ও এর ধারাবাহিকতা দেখা যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ একাধিকবার র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার আহবান জানালেও আগের সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। এমনকি যিনি ক্ষমতায় থাকতে র‌্যাব গঠিত হয়েছিল, সেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীও পরে আওয়ামী লীগ আমলে র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছিলেন। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে র‌্যাব এবং এর কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র সরকার। এরপর র‌্যাবের ক্রসফায়ার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) র‌্যাব বিলুপ্তির পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে (বিজিবি) কেবল সীমান্ত রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা পরিদপ্তরকে সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুপারিশ করে। সেসব আহ্বানে সাড়া না দিয়ে র‌্যাব গঠনের ২২ বছর পর ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এ বাহিনীর নাম পরিবর্তন করার কথা বলে। ওই সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছিলেন, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের নতুন নাম হবে স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দক্ষতা বাড়াতে সিঙ্গাপুর সহযোগিতায় আগ্রহী : বাংলাদেশের পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পেশাগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিগত ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতা দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর।

গতকাল সোমবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে সিঙ্গাপুরের অনিবাসী হাইকমিশনার ডেরেক লো এ আগ্রহের কথা জানান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ফয়সল হাসান এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন।

বৈঠকে দুই দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি, পুলিশের প্রশিক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, আন্ত দেশীয় সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, তথ্য বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং ফৌজদারি বিষয়ে পারস্পরিক আইনি সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়।