বাংলাদেশের অগ্রগতি ও পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো আমলাতন্ত্র। যেকোনো ভালো, সৃজনশীল এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য আমলাতান্ত্রিক জটিলতা সব সময়ই বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
এ বাধা কাটিয়ে যখন পরিকল্পিত ও টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, বিশেষজ্ঞরা যখন আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত নগর টেকসই উন্নয়নের দাবি করছেন, সেই সময়ে বিগত ইউনূস সরকার পরিকল্পিত এবং টেকসই উন্নয়নকে আরও জটিল ও কঠিন করে বিদায় নিল। এমন একটি আইন প্রণয়ন করে গেল, যা টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হবে।
গত বছরের ২৬ নভেম্বর প্রণীত ‘সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও টেকসই উন্নয়ন অধ্যাদেশ’ বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দুর্যোগ সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিকল্পিত নগর ও গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের একটি আইনি কাঠামো আমলাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করল নগর উন্নয়নে। এ অধ্যাদেশটি সুষম উন্নয়ন এবং কৃষি ভূমি রক্ষায় স্থানীয় ও জাতীয় পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় সাধন করবে বলা হলেও বাস্তবে বিশেষজ্ঞ এবং কারিগরি দক্ষদের ওপর ছড়ি ঘোরানোর সুযোগ করে দিয়েছে।
সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও টেকসই উন্নয়ন অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর মূল বৈশিষ্ট্য ও লক্ষ্য হচ্ছে, পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়া : পরিকল্পিত ও টেকসই নগর এবং গ্রামীণ অবকাঠামো গড়ে তোলার মাধ্যমে জনগণের জীবনমান উন্নয়ন। সমন্বিত ভূমি ব্যবহার : ভূমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধ করা।
টেকসই উন্নয়ন (SDG) : সামাজিক ন্যায্যতা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন। দুর্যোগ ও জলবায়ু সংবেদনশীলতা : দুর্যোগ ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলা করে স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন। কৃষি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ : কৃষিজমি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব প্রদান। স্থানীয় ও জাতীয় সমন্বয় : স্থানীয় উন্নয়নের সঙ্গে জাতীয় মহাপরিকল্পনার সমন্বয় করা। জনসম্পৃক্ততা : পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় স্থানীয় জনগণের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
এরকম সুন্দর কথার আড়ালে এ অধ্যাদেশটি আসলে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা কাঠামোর সূচনা করে, যা নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর ((UDD) এবং অন্যান্য সংস্থাকে একটি আইনগত ভিত্তি প্রদান করেছে। এর মাধ্যমে নগর পরিকল্পনাবিদ, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং এ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীদের ভূমিকা খাটো করে আমলাদের ভূমিকা মুখ্য করে তোলা হয়েছে। এর ফলে পরিকল্পিত নগরায়ণ যেমন বাধাগ্রস্ত হবে, তেমনি বাড়বে দুর্নীতি এবং দীর্ঘসূত্রতা।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত নগরায়িত দেশের মধ্যে অন্যতম।
অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অভাবনীয় সাফল্য লাভ করেছে; কিন্তু স্বাধীনতা অর্জিত হওয়ার ৫০ বছর পর এসে আমরা যা হারিয়েছি, তার পরিসংখ্যানও কোনো অংশে কম নয়। যেমন নগরীর প্রাকৃতিক নৈসর্গ, প্রবহমান বুড়িগঙ্গা, তুরাগসহ আরও অনেক প্রমত্তা নদী এবং খাল-বিল ইত্যাদি। সর্বোপরি রাজধানী ঢাকা শহর বর্তমানে অপরিকল্পিত নগরীর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
একমাত্র বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ছাড়া এই ঢাকা শহরে আর কোনো পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা নেই। নগরীতে বসবাসরত মানুষের সবুজ ছুঁয়ে দেখার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিনোদনের স্থান দখল করছে নানা ধরনের গ্যাজেট। বিনোদনের কথা বাদই দিলাম, মফস্বল থেকে একজন মানুষ তার স্বীয় প্রয়োজনে মহানগরীতে এলে তার রাতযাপনের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ এ নগর। শুধু ঢাকা মহানগরী কেন, পুরো বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত এ ধরনের সুযোগ সৃষ্টিতে ব্যর্থ।
অগ্রসরমান অর্থনীতির সঙ্গে তাল মেলাতে, জনশক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে এরকম বিষয় বিবেচনা করে টেকসই পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে বড় বড় শহর ও নগর ঘিরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারিত হচ্ছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে; তাই উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় মানুষ দলবেঁধে শহরে ছুটে আসছে। নগরায়ণ মূলত একটি রূপান্তর প্রক্রিয়া। এর ফলে গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে শহরায়ণের অর্থাৎ শিল্পায়নের দিকে ধাবিত হয়, কৃষিজমি কমে যায়, কৃষিজীবীরা অন্য পেশা গ্রহণ করে। স্বাধীনতার পর দ্রুতগতিতে এ নগরায়ণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রতি বছর দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ গ্রাম থেকে নগরে আসছে। প্রসঙ্গক্রমে চলে আসে বিকেন্দ্রীকরণের বিষয়টি। বাংলাদেশে কার্যত পরিকল্পিত বিকেন্দ্রীকরণ না থাকলেও প্রশাসনিকভাবে নামমাত্র বিকেন্দ্রীকরণ রয়েছে, যা বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্য অর্থাৎ আঞ্চলিক অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে পুরোপুরি ব্যর্থ।
দেশের ভূমি ব্যবহার, অবকাঠামো উন্নয়ন ও নগরায়ণ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে পরিকল্পিত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নতুন চিন্তা ও কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য দরকার পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, স্থপতি, প্রকৌশলী এবং পরিকল্পনাবিদদের নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগ। কিন্তু তা না করে ‘সমন্বিত স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও টেকসই উন্নয়ন অধ্যাদেশ’টিতে আমলাদের হাতে জাতীয় স্থানিক পরিকল্পনা পরিষদ এবং আন্তমন্ত্রণালয় কমিটিগুলোতে আমলাদের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে কয়েকজন বিশেষজ্ঞের পক্ষে বিশাল আমলাতান্ত্রিক বহরের সামনে বাস্তবিক ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে কার্যকর ভূমিকা পালন প্রায় অসম্ভব। একজন পেশাদার পরিকল্পনাবিদ বা প্রকৌশলী সাধারণত প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, তথ্যভিত্তিক গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে মতামত প্রদান করে থাকেন। কিন্তু প্রস্তাবিত কমিটিতে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় গভীর কারিগরি বিশ্লেষণে ঘাটতি দেখা দেবে। অধ্যাদেশে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান, কিংবা আরবান এরিয়া প্ল্যান প্রণয়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বা অংশীজনের সক্রিয় অংশগ্রহণের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। আর এ কারণেই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একটি কার্যকর ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কমিটিতে পর্যাপ্ত সংখ্যক পেশাদার পরিকল্পনাবিদ ও বিশেষজ্ঞ অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ড ইউনূসের সরকার ছিল একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এ ধরনের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার কেবল জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের থাকে। এ অধ্যাদেশটি গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হয়েছে। সবাই আশা করে, জাতীয় সংসদ এ বিতর্কিত এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের পথে বাধা এ আইনটি পুনর্মূল্যায়ন করবে।
সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন