জালিয়াতিতে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন : ড. মুহাম্মদ ইউনূস
২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০২ এএম | আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০২ এএম
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন, আমেরিকান বেস অব জাল এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা। ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে প্রযুক্তির হাত ধরেই। দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে দেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি জোরদারের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
গতকাল বুধবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে চার দিনের ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো ২০২৬ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ একটা বিষয়ে পৃথিবীর চ্যাম্পিয়ন, এখন আপনাদের সবার জানা আছে হয়তো, তবুও আমি আবার বলবো। বাংলাদেশ পৃথিবীতে চ্যাম্পিয়ন কীসে, জালিয়াতিতে। সব জিনিস জাল, বহু দেশ আমাদের পাসপোর্ট গ্রহণ করে না, ভিসা জাল, পাসপোর্ট জাল। আপনারা নিশ্চয় পত্রিকায় দেখেছেন- আমেরিকান বেস অব জাল এটা একটা জালিয়াতের কারখানা বানিয়েছি আমরা। আমাদের বুদ্ধি আছে, না হলে করতে পারতাম না। কিন্তু খারাপ কাজে লাগাচ্ছে। যে জালিয়াতি করতে জানে, তার আছে অনেক ক্রিয়েটিভিটি। আমি মধ্যপ্রাচ্যের একটা রাষ্ট্রের মন্ত্রীর সঙ্গে আলাপ করছিলাম, তারা বহুদিন ধরে আমাদেরকে প্রবেশাধিকার দিচ্ছে না। বাংলাদেশি কোনও মানুষকে প্রবেশের অধিকার দেবে না। এমনকি আমি যেটা তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করার জন্য, সর্বনি¤œ আমাদের যে মেরিনার, যারা জাহাজ চালান, দুনিয়াতে প্রাউড অব লিডিং ইন্ডাস্ট্রি, তারা জাহাজ চালান দুনিয়াতে। তারা এক বন্দর থেকে আরেক বন্দর, সেই তাদেরকে ওই দেশের বন্দরে যখন জাহাজ আসে, তখন কয়দিনের জন্য তারা ছুটি পান শহরে গিয়ে একটু ঘোরাফেরা করেন, আসা-যাওয়া করতে পারেন। জাহাজ ছেড়ে স্থলে আসতে পারেন। তারা বাংলাদেশি নাগরিক হলে ওই দেশে তাকে নামতে দেওয়া হয় না। আমি শুধু মিনতি জানালাম যে, বেচারারা জাহাজে জাহাজে ঘুরেন, অন্তত তাদের জন্য একটা পারমিশন দাও। তিনি (মন্ত্রী) বলছেন, আমাদের নিয়ম তো সবার জন্য প্রযোজ্য, আমরা কী করি! আমি বললাম তুমি আমার আবেদনটা গ্রহণ করো, শুধু তাদের জন্য দাও, আর যদি মনে করো। তো কয়েক মাস পরে শুনলাম যে, তারা মেরিনারদের পারমিশন দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা বলেন,বাংলাদেশিরা রিজেক্টেড হয়ে যাচ্ছে কেন? নানাজনের কাগজপত্র দেখলাম, শিক্ষার সার্টিফিকেট ভুল, জালিয়াত বলছে। একজন নারী যিনি আসছেন ডাক্তার হয়ে, তার ভিসা হলো ডাক্তারের ভিসা। আমি দেখেই বুঝলাম ডাক্তার হবার তার কোনও ক্ষমতা নাই। তার চেহারায় বলে না ডাক্তারের কিছু আছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন মেডিক্যাল থেকে পাস করেছেন? তখন কাগজপত্র ঘেঁটে একজনে বের করে দিলো মেডিক্যাল সার্টিফিকেট। তো স্টাফরা বলেন, স্যার এটা জাল, ভুয়া। বাকি সব সার্টিফিকেট তার জাল।
তিনি বললেন, আমার অ্যাসেসমেন্টে সুবোধ কাজ, ঢুকতে পারমিশন দিলে তিনি গৃহকর্মী হবেন। কিন্তু নিয়ে এসেছেন ডাক্তারের সার্টিফিকেট। কী হবে আমাদের! এই প্রযুক্তির কথা বলছি যে, এই প্রযুক্তি তিনি জালিয়াতির কাজে লাগাবেন, যদি না আমরা আগের থেকে নিজেদের সংশোধন করি।
হাজারে হাজারে মানুষ নানা ভুয়া সব পারমিশন, ভুয়া ব্যাংক সার্টিফিকেট এবং আমরা ইস্যু করছি। সেগুলো এবং জেনুইনলি ইস্যু করছি। যেখান থেকে যাবার কথা সেখান থেকে ইস্যু করছি। কাজেই আমাদেরকে প্রযুক্তিতে আসতে হলে ন্যায্য জিনিস নিয়ে আসতে হবে। এদেশ জালিয়াতের কারখানা হবে না, এটাকে আমরা করতে চাই না। আমরা নিজ গুণে দেশে, সারা দুনিয়াতে মাথা উঁচু করে চলতে চাই এবং সেই সামর্থ্য আমাদের আছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান আমাদের সামনে অনেক সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। যার নেতৃত্বে ছিল তরুণরা। এই তরুণরাই নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে, শুধু বাংলাদেশ নয় তারা গোটা বিশ্বের নেতৃত্ব দেবে। তাদের কোনোটাতে ঘাটতি নাই। আমরা শুধু টেনে রাখছি তাদেরকে। তাদেরকে ছেড়ে দিলে তারা ঘুড়ির মতো উড়ে বেড়াবে। বর্তমান তরুণ প্রজন্ম আগেকার প্রজন্ম থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমরা দেখতে একরকম, কথা বলি একরকম, মানুষ আমরা ভিন্ন। তারা আমাকে অনেক পেছনে ফেলে চলে গেছে। যেহেতু আমি এত কম স্পিডে হাঁটি, সে আমার সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে না। সে বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আজকের তরুণরা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচাইতে শক্তিশালী প্রজন্ম। এটা বিশ্বব্যাপী যেসব প্রজন্ম, এটা পৃথিবীর ইতিহাসে এত শক্তিশালী প্রজন্ম আর হয় নাই। এমন শক্তিশালী তারা কি সর্বকালের শক্তিশালী, না সর্বকালের সর্বশক্তি শক্তিশালী না এর পরের প্রজন্ম এর থেকে আরও বেশি শক্তিশালী হবে। এই দুই প্রজন্মের মুখ দেখাদেখি হবে না, এভাবে এটা চলবে। এই শক্তিটাকে আমরা কাজে লাগাতে পারছি। তাকে রিকগনাইজ করতে পারছি না। তাকে রিকগনিশন দিলে সে এগিয়ে আসতে পারতো, কাজটা করতে পারতো। এই যে পরিবর্তন, এই যে শক্তিশালী হয়েছে তার এসেন্সটা হলো প্রযুক্তি। ওর কারণেই সে ভিন্ন, সে আমার ছেলে আমার মেয়ে, কিন্তু ওই যে বললাম, তার কাছে আমি গুহাবাসী, যেহেতু তার কাছে ওই শক্তি আলাদিনের চেরাগ, তার হাতে এই আলাদিনের চেরাগ দিয়ে— সে যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। তিনি বলেন, গত অভ্যুত্থানের একটা কথা স্মরণ করছি, সবাই এর সঙ্গে পরিচিত। ইন্টারনেট যখন বন্ধ করে দেওয়া হলো, সব তরুণ সারা দেশে বিক্ষুব্ধ হয়ে গেছে। সে বিক্ষোভের পরিমাণ এত ছিল, তারা ফুটন্ত তেলের মতো টগবগ ছিল। কী হয়েছে? ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বুঝতে পারেন ইন্টারনেটটা তার প্রাণের কত প্রিয় জিনিস। এটা সহ্য করতে পারছে না। এমন টগবগ করলো এই উত্তেজনায় শেষ পর্যন্ত একটা মহাশক্তিশালী একটা সরকারকে পালাতে হলো। এই ইন্টারনেট বন্ধ তার একটা বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৫ বছরের বেশি সরকারি চাকরি থাকা ঠিক নয়।গোটা পৃথিবী খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কেউ সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করলে সে আর নিজেকে বদলায় না। আমি নিজের মতো করে বলি এটা, কেউ হয়তো সিরিয়াসলি নেয় না। আমি বলি, সরকারি কর্মচারী ৫ বছরের বেশি সরকারে থাকা ঠিক নয়। কারণ তার মন একটা কাঠামোর মধ্যে স্থির হয়ে গেছে, এ থেকে বের হতে পারছে না। আবার নতুন লোক, যারা বাইরে থেকে দেখছে, তাদেরকে নিয়ে আসতে হবে। এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে। ড. ইউনূস বলেন, প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে যদি এমন কেউ থাকে, যিনি প্রযুক্তি সম্পর্কে ৩০ বছর আগে বোঝাপড়া অর্জন করেছিলেন, ৩০ বছরে সারা দুনিয়া বদলে গেছে। সে তখন যা পেয়েছে, সেটাই তার কাছে আছে। এটা তার দোষ নয়। কাজেই যারা বর্তমান পরিবর্তন অনুভব করছে, তাদেরকে আসতে দিতে হবে।
প্রতিনিয়ত পরিবর্তন, প্রতিনিয়ত নীতি তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি বলেন, সরকার এই বিষয়টি খুব একটা ভাবছে না। তাই কতটা অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে, তা আমরা দেখছি। পুরোনো বস্তা ঘেঁটে নিয়মনীতি নিয়ে আসে। এটার ওপর সংশোধন করতে হবে। মূলটা পাল্টায় না। ওই যে বৃটিশ সরকার ধরিয়ে দিয়ে গেছে যেই নীতি, ওই নীতির ওপরই সে সংশোধন আনছে। ওটার তো মূল জিনিসেই গোলমাল। নতুন করে করাতে অসুবিধা কী? সব ঠেকার কাজ করে। আমার ঠেকা সামলানো, আমার প্রমোশন হবে আমি অন্য জায়গায় চলে যাবো। রাজনীতিবিদও তাই। আমার মনে হয় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ১০ বছরের পর পর নতুন করে গড়ে তোলা উচিত। একদম গোড়া থেকে। কারণ এ সময়ে পৃথিবী বদলে গেছে, নিয়মকানুন ও লক্ষ্য পরিবর্তিত হয়েছে, সে সেখানে স্থির হয়ে বসে আছে। এই পরিবর্তনগুলো আসতে হবে। তিনি বলেন, সরকারের প্রথাগত আচরণ হলো পুরোনো আঁকড়ে থাকা। আর প্রযুক্তির কাজ হলো সেই পুরোনো কাঠামো ফেলে দেওয়া। এই দ্বন্দ্বে প্রযুক্তিকেই জয়ী হতে হবে। নইলে আমরা জেতার সুযোগ হারাব। আমাদের নেতৃত্ব দিতে হবে, কিন্তু আমরা ফলোয়ার হয়ে বসে আছি।
আইসিটি বিভাগের সচিব শীষ হায়দার চৌধুরীর সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন,বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা এবং বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম।
বিভাগ : জাতীয়
মন্তব্য করুন
Comments
এই বিভাগের আরও
আরও পড়ুন
রাজনীতি করতে গিয়ে আবারও খুন : শেরপুর হত্যাকাণ্ডে হাসনাতের তীব্র প্রতিক্রিয়া
স্বর্ণের দাম তুঙ্গে: একদিনে ভরিতে বাড়লো ১৬,২১৩ টাকা
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ: রাজনীতির কারণে ক্রিকেটের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ
শেরপুর জেলা বিএনপির ৪১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি স্থগিত
দুপুরে জরুরি সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে জামায়াত
‘এখনো পিঠে ব্যথা হয়, এটা আমাকে দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়’
হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে ১১ দলের জোয়ার বন্ধ করা যাবে না: নাহিদ ইসলাম
প্রথমবার পডকাস্টে তারেক রহমান: তুলে ধরবেন আগামীর বাংলাদেশের রোডম্যাপ
সন্ত্রাস, চাঁদাবাজ ও মাদকমুক্ত সাভার গড়ার অঙ্গীকার ডা. সালাউদ্দিন বাবুর
জাতীয় নির্বাচনে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালনের আহ্বান
রাজশাহীতে বিএনপির নির্বাচনী জনসভার মঞ্চ প্রস্তুত, মাঠে নেতাকর্মীদের ঢল
দক্ষিণ আমেরিকায় বিমান বিধ্বস্ত: কলম্বিয়ার সংসদ সদস্যসহ সব আরোহীর মৃত্যু
জামায়াতের ইতিবাচক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের
হবিগঞ্জে এনসিপিতে বড় ধাক্কা: একসঙ্গে ১৩ নেতার পদত্যাগ
জামায়াত নয় একমাত্র আমরাই ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চাই: চরমোনাই পীর
১৪ বছর পর ঢাকা–করাচি সরাসরি বিমান চলাচল শুরু
মার্কিন ভিসানীতিতে পরিবর্তন, ভারতীয়দের মাথায় হাত
২২ বছর পর তারেক রহমান আজ রাজশাহীতে যাচ্ছেন
শেরপুরে জামায়াত নেতা নিহত, আমিরের কড়া বার্তা
মিশরে তিন মাস ধরে নিখোঁজ ঝিনাইদহের যুবক ইমন পথ চেয়ে আসে আছে মা
No one has commented yet. Be the first!