| শিরোনাম |
❒ স্টারলিংকের বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট গেটওয়ে স্থাপন ছবি: প্রতীকী
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক গত বছর মে মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে তাদের যাত্রা শুরু করে। তবে বাধ্যতামূলক নিয়ম থাকা সত্ত্বেও তারা শুরুতে স্থানীয় গেটওয়ে ছাড়াই বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করেছিল, যা নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)–এর নজর কাড়ে।
সম্প্রতি স্টারলিংক বাংলাদেশের মধ্যে গেটওয়ে স্থাপনের পরিকল্পনা জানিয়েছে এবং দেশে গ্রাউন্ড স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার করার জন্য বিটিআরসিতে আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের আবেদন করেছে। এর ফলে, তারা বাংলাদেশে স্থাপিত পপ (পয়েন্ট অব প্রেজেন্স) থেকে সিঙ্গাপুর ও ওমানের পপে আন্তর্জাতিক ব্যাকহল সংযোগ স্থাপন করতে চায়।
স্টারলিংকের চিঠি অনুযায়ী, এই আন্তর্জাতিক ট্রানজিট সার্ভিসের জন্য তারা দেশীয় প্রতিষ্ঠান ফাইবার অ্যাট হোম, বিএসসিসিএল ও সামিট থেকে আইপিএলসি (ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট লিজড সার্কিট) এবং আনফিল্টারড আইপি ক্রয় করবে। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আনফিল্টারড আইপি দিয়ে তারা শুধুমাত্র বিদেশি ব্যবহারকারীদের জন্য ডাটা পরিবহন করবে, বাংলাদেশি ব্যবহারকারীরা এর আওতায় পড়বে না।
আইপিএলসি হলো একটি আন্তর্জাতিক ডাটা পরিবহন ব্যবস্থা, যেখানে একটি দেশের নেটওয়ার্ক থেকে সরাসরি অন্য দেশের পপে ডাটা পাঠানো হয়। আনফিল্টারড আইপি হচ্ছে এমন একটি ফিল্টারবিহীন আইপি ব্লক, যার মাধ্যমে ডাটা কোনো ফিল্টারিং, কনটেন্ট ব্লকিং বা নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই আন্তর্জাতিক লিংকে পাঠানো যায়। স্টারলিংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের নেটওয়ার্কের রেজিলিয়েন্সি ও রিডান্ডেন্সি নিশ্চিত করতে একাধিক পপ যুক্ত থাকবে।
তবে বিটিআরসি এবং দেশের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্টারলিংকের এই পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং আইনগত নজরদারির সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিটিআরসির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গাইডলাইনে আইপিএলসি শুধু সিগনালিংয়ের জন্য, ট্রাফিকের জন্য নয় এবং এই অনুমোদন দিলে দেশের নজরদারির বাইরে ডাটা প্রবাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দেশের কয়েকজন খ্যাতিমান প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ স্টারলিংকের প্রস্তাব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। ফাইবার অ্যাট হোমের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা সুমন আহমেদ সাব্বির মনে করেন, আন্তর্জাতিক ট্রাফিক পরিবহনের ক্ষেত্রে আনফিল্টারড আইপি ব্যবহারে দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো উপকৃত হবে। অন্যদিকে, এনটিটিএনের প্রধান পরিচালক রাশেদ আমিন বিদ্যুৎ মনে করেন, সাইবার নিরাপত্তার কারণে এই আইপির ব্যবহার সীমাবদ্ধ হওয়া উচিত এবং বিশেষ মনিটরিং সেলের প্রয়োজন।
বিটিআরসির মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শফিউল আজম পারভেজ জানিয়েছেন, স্টারলিংকের আবেদন এখনো যাচাইয়ের পর্যায়ে আছে এবং গাইডলাইনের বাইরে গিয়ে কোনো অনুমোদন দেওয়া হবে না। দেশে স্থাপিত চারটি স্থানীয় গেটওয়ের কার্যকারিতাও বিটিআরসি নিশ্চিত করতে পারেনি, কারণ পরিদর্শনের সময় স্টারলিংকের প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না।
স্টারলিংক ২৯ এপ্রিল অপারেটিং লাইসেন্স পাওয়ার পর ৮ মে থেকে পরীক্ষামূলক সেবা চালু করেছিল, তবে গেটওয়ে স্থাপন বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও তা শুরুতে পূর্ণ হয়নি। বিটিআরসির মতে, ভবিষ্যতে এই বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ এবং নিরাপত্তার বিষয়গুলো সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ যদি স্টারলিংকের আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ট্রানজিট করিডোর হিসেবে গড়ে ওঠে, তবে তা অর্থনৈতিক দিক থেকে সুযোগ তৈরি করবে। দেশীয় টেলিকম ও আইটি খাত লাভবান হবে, পাশাপাশি বৈশ্বিক নেটওয়ার্কের অংশীদার হওয়ার মাধ্যমে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিশ্চিত হবে।
তবে একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, নীতিমালা ও বাজার কাঠামোর ভারসাম্য রক্ষা করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। নিরাপত্তা বিধান অপ্রতুল হলে তথ্যের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবাহ জাতীয় নিরাপত্তায় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
বাংলাদেশের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরে বিটিআরসি, সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও খাত সংশ্লিষ্টদের সতর্ক এবং সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করাই সময়ের দাবি।