শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে যা বললেন পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী
- নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- ০৪ নভেম্বর ২০১৮, ১০:০৪
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিবেশী ভারত কী দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে তা যে কয়জন ব্যক্তির লেখায় পাওয়া যায় তাদের মধ্যে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী অন্যতম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সচিব পদমর্যাদার চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি দিল্লিভিত্তিক অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ডিস্টিংগুইশড ফেলো হিসেবে আছেন। তিনি বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছাড়াও থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার লেখা এই নিবন্ধ কুয়ালালামপুরভিত্তিক সাউথ এশিয়ান মনিটরে গতকাল শনিবার প্রকাশিত হয়। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি বোঝার জন্য এই লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে এটি নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো
বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি গরম হতে শুরু করেছে। বিরোধী দল তড়িঘড়ি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। এক দশক ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। চলতি বছরের শেষ নাগাদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারি নাগাদ নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিরোধী দলগুলোর জোট গঠনের চেষ্টা স্বাভাবিক কিছু সমস্যার মুখে পড়েছে। যেমন আদর্শের দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব ও সমন্বয়ের অভাব।
হাসিনা সম্প্রতি সৌদি আরবে সরকারি সফর থেকে ফিরেছেন। সেখানে তিনি সৌদি নেতাদের সাথে বৈঠক করেছেন এবং কয়েকটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন, যার মধ্যে সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও রয়েছে। হাসিনা ২৩টি দেশের সামরিক কন্টিনজেন্টের যৌথ প্যারেডেও উপস্থিত ছিলেন, যেখানে মুসলিম দেশগুলোর সামরিক জোটের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়, যেটার উদ্যোক্তা সৌদি আরব। সৌদি আরবে সরকারি সফরে দ্বিপক্ষীয় এজেন্ডা ছাড়াও সাধারণত মক্কায় ওমরাহ পালনের বিষয় যুক্ত থাকে। সৌদি আরবে সরকারি সফর এবং বাদশাহ ও ক্রাউন প্রিন্সের সাথে বৈঠকের বিষয়গুলো সাধারণত ভোটারদের কাছে বিশেষ করে ধর্মপ্রাণ মানুষের জন্য ইতিবাচক ইঙ্গিত বহন করে। কিছু বাংলাদেশী ভোটার এ ধরনের সফরকে হাসিনা এবং তার নিজের ধার্মিকতার প্রতি সৌদি সমর্থন হিসেবে দেখে থাকে, যদিও বেশির ভাগ ভোটারের কাছে এটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি মাত্র গরম হতে শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ যেখানে কিছু আশার আলো দেখতে পাচ্ছে। ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় দেয়া সাম্প্রতিক রায়ে বিরোধী দল বিএনপির বেশ কিছু নেতাকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের দণ্ড দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমান রয়েছেন, যিনি বর্তমানে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তারেক বর্তমানে বিচার থেকে পলাতক রয়েছেন এবং ২০০৯ সাল থেকে লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাকে আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে এবং বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক দুইজন মন্ত্রীসহ ১৯ জন অভিযুক্তকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে।
খালেদা জিয়া দুর্নীতির দায়ে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের অংশ হিসেবে কারাগারে রয়েছেন। ১৯ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তের মধ্যে সিনিয়র গোয়েন্দা ও পুলিশ কর্মকর্তারাও রয়েছেন, যাদের বিরুদ্ধে গ্রেনেড হামলা চালানোর জন্য ধর্মীয় চরমপন্থী সংগঠন হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামিকে (হুজি) ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। বিএনপির জন্য এটি আরেকটি বড় আঘাত। এমনিতেই খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় এবং তারেক রহমান বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বিদেশে থাকায় দলটি বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছে। অতি সম্প্রতি জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট মামলায় আদালত খালেদা জিয়াকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। আরেকটি কথিত দুর্নীতি মামলায় তাকে সাত বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় বিএনপি ভিন্ন মতের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে জাতীয় ঐক্য বা ন্যাশনাল ইউনিটি ফ্রন্ট গড়ে তুলেছে। অস্বাভাবিক এই রাজনৈতিক জোটের নেতা হলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণফোরামের প্রধান ড. কামাল হোসেন। ড. কামালের সাথে আওয়ামী লীগের তিক্ত সম্পর্ক বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ নাটক হয়ে আছে। আরেক নেতা দলত্যাগ করে আসা রাজনীতিবিদ মেডিক্যাল চিকিৎসক ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, যিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ছিলেন। বিএনপি সরকার তাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছিল। তার নতুন রাজনৈতিক দল এক সময় বিকল্পধারা বিরোধী জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যান্যের মধ্যে রয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ও নাগরিক ঐক্য। বিএনপি ইসলামি দলগুলোর সমর্থন নিয়ে ফ্রন্টে যোগ দিয়েছে।
বিরোধী জোটের মধ্যে ফাটলের কারণে আওয়ামী লীগের প্রতি চ্যালেঞ্জটা এমনিতেই কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। বিকল্পধারা জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দেয়ার জন্য একটা নৈতিক অবস্থান গ্রহণ করেছে, বিএনপি যাতে ইসলামি দলগুলোর বোঝা ছেড়ে জোটে যোগ দেয়। এরা বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের সাথে ছিল। ড. হোসেন আরো উদারমনা এবং ইসলামি দলগুলোর অন্তর্ভুক্তিতে তার আপত্তি নেই। এই মতভেদ এরই মধ্যে নতুন বিরোধী জোটে বিভেদ সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগও হেফাজত ও অন্যান্য রক্ষণশীল ইসলামি সংগঠনের মতো আরেক শ্রেণীর ইসলামপন্থীদের কাছে টানার ক্ষেত্রে ততটা পিছিয়ে নেই। নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এটি বোধগম্য। কারণ এটি ধর্মীয় দলগুলোকে বিভক্ত করে ফেলবে। আওয়ামী লীগের সেকুলার অংশ এবং তাদের অন্য সমর্থকেরা এই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ। তারা মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত দলের প্রতিষ্ঠাকালীন নীতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা। রাজনীতির কারণে সব জায়গাতেই অদ্ভুত সঙ্গীদের সাথে চলতে হয়।
বিরোধী জাতীয় ফ্রন্ট ও নাগরিক সমাজের গ্রুপগুলোর জোটের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনমতকে জাগিয়ে দেয়া, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু’ নির্বাচন হলে যে আওয়ামী লীগ নিশ্চিত হেরে যাবে এই প্রচারণা চালানো। তাদের দাবি হাসিনা যাতে পদত্যাগ করেন এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। হাসিনা এ দাবি বাতিল করে দিয়েছেন। উভয় রাজনৈতিক পক্ষই তাদের নিজেদের অনুকূলের মতামত জরিপগুলোর কথা বলছেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা মার্কিনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিক ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক এক জরিপের কথা বলছেন, যেখানে অর্থনৈতিক অর্জনের জন্য হাসিনার নেতৃত্বের কৃতিত্ব দেয়া হয়েছে। এই জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে যে জনগণের মতামত সাধারণভাবে হাসিনা সরকারের নীতির পক্ষেই রয়েছে।
হাসিনা সরকার এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) থেকেও স্বীকৃতি পেয়েছে। তার সরকার বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হারকে ভারতের চেয়েও ওপরে নিয়ে গেছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে তিনগুণ গতিতে বাড়ছে। বাংলাদেশ তাদের এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে পারলে তাদের মাথাপিছু আয় আগামী দুই দশকে ভারতকে ছাপিয়ে যাবে। বাংলাদেশে মাইক্রো-ক্রেডিট চালু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রাইভেট সেক্টরের বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং স্থিতিশীল রেমিট্যান্স প্রবাহের কারণে এই অর্থনৈতিক সাফল্য অর্জিত হয়েছে। সামাজিক সূচকে, বাংলাদেশ ভারতসহ বহু দেশের চেয়ে ভালো করছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশনায় দেয়া আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী এই অর্জন হয়েছে বাংলাদেশের।
তবে এখনো বাংলাদেশ ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সুবিধাভোগী পুঁজিপতি শ্রেণী, ব্যাংকের অব্যবস্থাপনা, বিভক্ত নির্বাচন কমিশনসহ অনেক সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। শত্রুতা ও ক্ষোভ আরো বাড়িয়েছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তরুণ সমাজ, যারা মূলত ইন্টারনেটে সেঁটে আছে, তারা কঠোর এই বিধিনিষেধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করবে, যেটার অধীনে বেশ কিছু মানুষকে আটক করে রাখা হয়েছে।
হাজার হাজার মনোনয়নপ্রত্যাশীর ভেতর থেকে যোগ্য প্রার্থীকে বাছাই করা আওয়ামী লীগের জন্য একটা কঠিন কাজ। নির্বাচনের আগে তাদের প্রথম ঘর পরিষ্কার করতে হবে। যেসব এমপি ও মন্ত্রী যথাযোগ্যভাবে কাজ করতে পারেননি, তাদের মনোনয়ন দেয়া উচিত হবে না। বাংলাদেশে একটি প্রজন্মের পরিবর্তন হচ্ছে এবং প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এটা বিবেচনায় রাখা উচিত। দুর্নীতিগ্রস্তদের অবশ্যই বাদ দিতে হবে এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের বেশি প্রতিনিধিত্ব দিতে হবে।
আওয়ামী লীগ অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে জর্জরিত হয়ে আছে এবং টুকরো টুকরো বিরোধী দলের চেয়ে এটাই তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগ ভারতের সহায়তা নিতে পারে। গত এক দশকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দারুণ শক্তিশালী হয়েছে এবং অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও হাসিনা দক্ষতার সাথে দেশের নীতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। ভারত নিশ্চিতভাবেই আরো পাঁচ বছর শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করবে।